নিউজিল্যান্ডের মাটিতে একের পর এক রেকর্ড ভেঙ্গে চুরমার করছেন টাইগাররা

ভালো শুরুর পরও হারের উদাহরণ রয়েছে টাইগারদের। বেশি দূরে ফিরে তাকাবেন না। চার বছর আগে ওয়েলিংটনে প্রথম ইনিংসে ৫৯৫ রানে হারার পর নিউজিল্যান্ডের কাছে প্রথম ইনিংসে আট উইকেটে হেরেছিল বাংলাদেশ।

মাউন্ট মাংনুইতে এমন ঘটনা আর ঘটবে না তা জোর দিয়ে বলার উপায় নেই। এ টেস্টে কী হবে? বাংলাদেশ বীরের মত লড়ে ম্যাচ জিতে নেবে? ড্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে? নাকি হেরেই যাবে? তা বলে দেবে সময়। তবে ম্যাচের তৃতীয় দিন শেষে ম্যাচের যে অবস্থা, তাতে ড্র করার যথেষ্ঠ সুযোগ আছে মুমিনুল বাহিনীর। সেটা নির্ভর করবে মঙ্গলবার চতুর্থ দিন সকালের সেশনের ওপর। ভেঙে বললে ইয়াসির আলি ও মেহেদি হাসান মিরাজের ওপর।

তারা প্রথম সেশন না হলেও যদি অন্তত প্রথম ঘন্টা পার করে দিতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের অন্তত ম্যাচ হারের ঝুঁকি কমে যাবে অনেকটাই। তখন হয়ত দেড়শ রানের একটা লিড হতে পারে। সেই ঘাটতি পুষিয়ে চতুর্থ ইনিংসে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে গেলেও নিউজিল্যান্ডকে আরও একদিন খেলতে হবে। যা সহজ নয় মোটেও। বরং তাতে ব্ল্যাকক্যাপসদের হারের ঝুঁকি থাকবে। হয়তো তারা সে কাজটি করতে চাইবে না।

ঘুরিয়ে বললে মুমিনুলের দলও কিউইদের তা করতে দেবে না। তাতে করে ম্যাচ অনিবার্য ড্রয়ের দিকে মোড় নেবে। কাজেই যা হয়েছে, সেটিই অনেক স্বস্তির। তারপরও আছে আফসোস। মুমিনুল হক (৮৮), লিটন দাস (৮৬) ও মাহমুদুল হাসান জয় (৭৪)- তিনজনের সামনেই ছিল শতরানের হাতছানি। কিন্তু কেউ পারেননি। সেই না পারা নিয়ে দিনশেষে অনেকেরই দীর্ঘনিশ্বাস। তবু মুমিনুল-লিটনদের ধৈর্য্য-মনোযোগের প্রশংসা সবার মুখে মুখে।

সবার একটাই কথা, ট্রেন্ট বোল্ট, টিম সাউদি, নেইল ওয়াগনার কাইল জেমিসনে সাজানো ধারালো ফাস্ট বোলিংয়ের বিপক্ষে যতটা সাহস, আত্মবিশ্বাস ও সংযম নিয়ে ব্যাট করা সম্ভব, তার প্রায় পুরোটাই করেছেন জয়, মুমিনুল, লিটনরা। মনোসংযোগের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছিলেন মুমিনুল-লিটন। এত দায়িত্ব সচেতন, পুরোদস্তুর টেস্ট ব্যাটিং খুব কমই দেখা যায়। রানের হিসেবে মুমিনুল-লিটনের এ জুটি টেস্টে বাংলাদেশের ২৬তম বড় জুটি।

পঞ্চম উইকেটেও মুমিনুল-লিটনের যোগ করা ১৫৮ রান সবচেয়ে বড় নয়। পঞ্চম উইকেটেও এটা ৬ নম্বর দীর্ঘ জুটি। সবচেয়ে বড় জুটি সাকিব আল মুশফিকুর রহিমের ৩৫৯ রান।তাহলে এই জুটির বন্দনা কেন? বন্দনা এই কারণে যে, টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সাধারণত যা করতে পারেন না, তারা আজ সেটিই করে দেখিয়েছেন। একদম আদর্শ টেস্ট ব্যাটিং যাকে বলে, দুজন বিশেষ করে মুমিনুল তাই করেছেন।বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বল ছেড়ে খেলতে পারেন না।

ধৈর্য্য ধরে উইকেটে থেকে হাফ ভলি, ওভারপিচ ডেলিভারি কাজে লাগিয়ে রান করার চেয়ে ছটফট করে অযথা অপ্রয়োজনে বল তাড়া করে শটস খেলতে গিয়ে উইকেট দিয়ে আসার নজির শত শত। বাউন্সার থেকে ব্যাট ও শরীর সড়ানোয় দক্ষতা খুব কম। এতকাল এসব অভিযোগ ছিল টাইগার ব্যাটারদের বিপক্ষে। কিন্তু আগের দিন ২১ বছরের তরুণ জয়, আজ মুমিনুল-লিটন সেসব অভিযোগ ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছেন। কীভাবে একেক পর এক বল ছাড়তে হয় তা দেখিয়েছেন।

জয় ও লিটন বাইরের বল তাড়া করে কট বিহাইন্ড হলেও, আউট হওয়ার আগে অফস্ট্যাম্পের বাইরে ছিলেন অনেক সতর্ক। একদম ঠাণ্ডা মাথায় বলের মেধা গুণ বিচার করে স্ট্যাম্পের বাইরে বল ছেড়েছেন, খাটো লেন্থের বলগুলোয় পুল-হুকের ঝুঁকি না নিয়ে ডাক করেছেন। মুখ সমান উচ্চতায় লাফিয়ে ওঠা ডেলিভারিগুলোকে আস্থার সঙ্গে নরম হাতে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছেন। বাঁহাতি ওয়াগনার-বোল্ট, ডানহাতি সাউদি-জেমিসনের শর্ট বলে একজনও ফরোয়ার্ড শর্ট লেগ, লেগ স্লিপ বা সিলি পয়েন্ট, সিলি মিড অফ-অনে ক্যাচ দেননি।

মুমিনুল ৮৮ রান করতে উইকেটে ছিলেন ৩৭০ মিনিট, বল খেলেছেন ২৪৪টি। স্ট্রাইকরেট ৩৬.০৬। আর লিটন দাস উইকেটে ছিলেন ৪ ঘন্টা ৭ মিনিট, বল মোকাবিলা করেছেন ১৭৭ টি। তার স্ট্রাইকরেটও ৫০-র কম; ৪৮.৫৮। ২০১৭ সালে ওয়েলিংটনে ৩৫৯ রানের পার্টনারশিপ গড়ার নায়ক সাকিব ডাবল সেঞ্চুরি (২১৭) করেছিলেন ৪১৮ মিনিটে, বল খেলেছিলেন ২৭৬টি; ৭৮.৬২ স্ট্রাইকরেটে বাউন্ডারি হাঁকিয়েছিলেন ৩১টি। আর মুশফিকুর রহিম ৩৬৫ মিনিটে ২৬০ বলে ২৩ বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় ৬১.১৫ স্ট্রাইকরেটে উপহার দিয়েছিলেন ১৫৯ রানের ‘বিগ হান্ড্রেড।’

ওভাবে চালিয়ে না খেলেও যে টেস্ট খেলা যায়, বাহারি ও আক্রমণাত্মক মারের তোড়ে মাঠ গরম না করেও যে লম্বা সময় উইকেটে থাকা যায়- সেটিই দেখিয়েছেন জয়, মুমিনুল, লিটনরা। শক্তিতে এগিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে টেস্ট ড্র করতে এমন ব্যাটিংই দরকার। ফল যাই হোক, সেই কাজটি অন্তত করতে শিখেছে মুমিনুলের দল। সেটাই বা কম কী?

Leave a Reply

Your email address will not be published.